
কেন আপনার একটি ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লেখা দরকার?
যেকোনো পেশা বা ক্যারিয়ারে আগের চেয়ে এখন প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। নারী পুরুষ যেকারোরই এগিয়ে যেতে হলে এই প্রতিযোগিতা এড়ানোর উপায় নেই। এর বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে যখন কারো কাছে নিজের লক্ষ্যগুলি স্পষ্ট থাকবে, যেকোনো লক্ষ্য অর্জন আগের চেয়ে সহজ হয়ে যাবে।
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট এই কাজটিই আপনার জন্য সহজ করে দেয়।
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট মূলত আপনার অতীত ও বর্তমান ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা, আগ্রহ, ভবিষ্যৎ প্রফেশনাল লক্ষ্যের একটি বর্ণনা বা বিবৃতি। ভবিষ্যতে কী করতে চান এবং জীবনের পরবর্তী কয়েক বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান, তাই মূলত এই স্টেটমেন্টে লেখা থাকে।
আপনি যদি কখনো প্রফেশনাল গোল বা লক্ষ্য নিয়ে না লিখে থাকেন, তাহলে একটি ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট দিয়ে কাজটা শুরু করতে পারেন।
ভাল একটি ক্যারিয়ার গোল স্টেটমেন্ট লিখতে পারলে নিজের ক্যারিয়ার স্টেটমেন্টটিও লিখতে পারবেন সহজেই।
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট কী ?
স্টেটমেন্ট লেখার ক্ষেত্রে নিজের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে কী কী অর্জন করতে চান তা কয়েকটি বাক্যে লিখে ফেলুন নিজের ক্যারিয়ার স্টেটমেন্টে।
সহজ শোনাচ্ছে না? ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লেখার জন্য ক্যারিয়ারের লক্ষ্য ও তা অর্জনের পথের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এর আগে, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে আপনাকে কী করতে হবে তা নিয়ে একটু রিসার্চ করে নিন।
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট দরকারি কেন?
আপনার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলি কী এবং আপনি কেন তা অর্জন করতে চান সেটা যাতে কখনোই না ভোলেন, তা নিশ্চিত করবে এই স্টেটমেন্ট। ফলে একটি সাফল্যের রোডম্যাপের মতোই আপনার ক্যারিয়ারের পথটি চোখের সামনে ভেসে উঠবে।
সাফল্য অর্জনের মূলে থাকা ৩টি বিষয়ে ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট আপনার কাজে লাগবে।
- অনুপ্রেরণা: কোন বিষয়গুলি আপনাকে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে নিজের লক্ষ্য পূরণে কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগাবে?
- দিক নির্দেশনা: ক্যারিয়ারের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে? আপনার কি কোনো কোর্স করতে হবে, কিংবা অন্য কোনো শহরে যেতে হবে অথবা ভাল ভাবে নেটওয়ার্ক করতে হবে?
- দায়বদ্ধতা: লক্ষ্য থাকা ভাল, কিন্তু সেগুলির সাথে আপনাকে সংযুক্ত থাকতে সাহায্য করছে কে ও কী?
কীভাবে লিখবেন ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট?
ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা নিজের বিষয়ে নতুন কিছু জানার দারুণ একটি উপায়। ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করার সময় কেমন ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স চান, বাসা থেকে কাজ করতে চান কিনা, কোথায় থাকতে চান, ম্যানেজার হতে চান কিনা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করতে পারেন নিজেকে।
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লিখতে এই টিপসগুলি দেখে নিন:
- নিজের আগ্রহ ও উদ্দেশ্যের কথা ভাবুন
এই দু’টি বিষয় আপনার জীবনকে পরিচালনা করে। আগ্রহ ও উদ্দেশ্যের দিকে মনোযোগ দিলে জীবনে কী অর্জন করতে চান তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
যেমন: “গল্প বলা ও লেখালেখি করার ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী।”
- রিসার্চ করুন
আপনি কী করতে চান তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে এই ধাপে খুব একটা সময় লাগবে না। কিন্তু পেশাগত জীবনে কী করতে চান তা স্পষ্টভাবে জানা না থাকলে, সময় নিয়ে রিসার্চ করুন।
নিজের নেটওয়ার্কের মানুষদের সাথে আলাপ করুন। পছন্দের ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। পছন্দের চাকরি পেতে যেসব দক্ষতা দরকার তা শিখে নিন, ও সাফল্যের পথে যেসব বাধা আসতে পারে সেগুলির সাথে নিজেকে পরিচিত করান।
যেমন: “আমি একটা কাল্পনিক উপন্যাস লিখতে আগ্রহী।”
- নিজের রিসার্চ যাচাই করে নিন
এই সময়টা কৌতূহল, অভিজ্ঞতা অর্জন ও প্রতিফলনের সময়। নিজের রিসার্চ যাচাই করে নিন। আপনি যদি ক্যারিয়ার বদলাতে চান, তাহলে যে ইন্ডাস্ট্রিতে যেতে চান তার একটি সেমিনারে অংশ নিন। আপনি হয়ত সেখানে একঘেয়ে অনুভব করতে পারেন, যার অর্থ হচ্ছে আপনাকে নিজের পরিকল্পনা বদলাতে হবে।
নতুন কিছু শেখার সময় নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, যা শিখছেন তা বুঝতে পারছেন কিনা? টপিকের সাথে কোনো সংশ্লিষ্টতা অনুভব করছেন কিনা?
যেমন: “একটি স্টোরি লিখেছি, এজন্য আমি আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করছি।
- স্মার্ট গোল বা লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
স্মার্ট গোল মডেল আপনাকে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে। স্মার্ট মডেলের অর্থ নির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য, অর্জনযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও সময়ের মধ্যে শেষ করা যাবে এমন গোল নির্দিষ্ট করা।
এই পর্যায়ে নিজের লক্ষ্যগুলি সম্পর্কে আপনার বেশ পরিষ্কার ধারণা তৈরি হওয়ার কথা। নানারকম উপাদানের তালিকা বানানোর পর আপনার লক্ষ্য যদি পরিকল্পনা মতো না আগায়, তাহলে তা বদলাতে পারেন। সময়ের সাথে ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে আপনার লক্ষ্য বদলাতে হতে পারে। এর সাথে মানিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি রাখুন। যেমন: “আমি এই মাসের শেষ দিকে ৩০০ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস শেষ করার কথা ভাবছি। তারপর সেগুলি তিনজন প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে তাদের মতামতের অপেক্ষা করব।”
- শক্তিশালী কাজের পরিকল্পনা তৈরি
আপনি নিজের আগ্রহের বিষয়গুলি খুঁজে বের করেছেন, গবেষণা ও এক্সপেরিমেন্ট করেছেন এবং নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এবার অ্যাকশন প্ল্যান বা কাজের পরিকল্পনা বানানোর সময়। নিজের লক্ষ্য অর্জনে কী কী পদক্ষেপ নেবেন, তা ভাবুন। আপনার কি নতুন কিছু শিখতে হবে, নিজের কমিউনিকেশন স্কিল আরো ভাল করতে হবে?
আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখলে তাতে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে এবং সহজভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করা যায়। এছাড়াও এর কারণে সম্ভাব্য মানসিক চাপ ও দীর্ঘসূত্রিতা কমানো যায়। যেমন: “আমার উপন্যাসটি শেষ করার জন্য একটি টাইমলাইন বানাব, এর মধ্যে ব্রেইনস্টর্মিং, লেখা ও রিভিশনের সময়ও থাকবে। তাহলে আমি সঠিক গতিতে কাজ করতে পারব ও প্রতিটি সেকশনে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারব।”
- দরকারে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারেন
আপনি অনেক সময় ও প্রচেষ্টা দিয়ে একটি অর্জনযোগ্য, সুচিন্তিত ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট বানিয়েছেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু ঘটতে পারে। নানারকম বাধা আসতে পারে, যেগুলির ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
যেকোনো পরিস্থিতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা রাখুন। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিন ও সেগুলি কাজে লাগান। যেকোনো পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা আপনাকে সাফল্যের পথে অনেকখানি এগিয়ে দিবে। যেমন: “যে প্রকাশকদের আমার উপন্যাসটি পাঠিয়েছি, তাদের কেউ’ই সাড়া দেননি। তাই আমি আরো কয়েকজনকে উপন্যাসটি পাঠাব। আমার নেটওয়ার্কের সদস্যরা উপন্যাসের আইডিয়া আরো স্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে লেখার পরামর্শ দিয়েছেন। আমি সেটাই এখন চেষ্টা করে দেখব।”
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্টের উদাহরণ
লক্ষ্য, ইন্ডাস্ট্রি ও জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট নানারকম হতে পারে। আপনি হয়ত কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করতে চান কিংবা টেক ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু করতে চান। ক্যারিয়ারে আপনি যা কিছু অর্জন করতে চান, ক্যারিয়ার স্টেটমেন্টে সেটা ফুটিয়ে তুলতে হবে। ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লেখার এই উদাহরণগুলি দেখে নিতে পারেন।
1. “দুই বছরের মধ্যে আমি একজন পূর্ণকালীন লেখক হব। একজন ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ শুরু করে আমার পোর্টফোলিও বানাব, নেটওয়ার্ক বাড়াব ও লেখালেখি বিষয়ে নানারকম ওয়ার্কশপ ও সেমিনারে অংশ নিব। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় আমি বিখ্যাত লেখকদের লেখা পড়ব। সম্পাদকরা ফিডব্যাক দিলে আমি সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করব।”
2. “আমি উদ্যোক্তা হব ও আগামী বছর একটি ক্যাফে খুলব। এই ক্যাফেতে আমি একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করব যেখানে উদারতা, সহানুভূতি ও অন্যকে শ্রদ্ধা করার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। মার্কেটিংয়ের বিষয়ে কিছু কোর্স করার মাধ্যমে ও ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের সাথে কথা বলে বিজনেস ও উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে নিজের ধারণা আরো বাড়াব।”
লেখা শুরু করুন
ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লেখার ধাপ ও সুবিধাগুলি আমরা উল্লেখ করেছি। এখন আপনার নিজের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করা ও লেখা শুরু করার সময়।
পছন্দ মতো ক্যারিয়ার স্টেটমেন্ট লেখা হলে তা এমন কোথাও রাখুন যেখানে তা সহজে আপনার চোখে পড়বে। হাতে লেখা কিংবা প্রিন্ট করা স্টেটমেন্টটি ফ্রিজের ওপর কিংবা বাথরুমের আয়নায়, অথবা টেবিলের ওপর টানিয়ে নিন।
আর যদি ডিজিটাল স্টেটমেন্ট লেখেন, তাহলে তা ফোনের লক স্ক্রিনে সেট করুন। হাতের কাছে রাখুন। তাহলে কোন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন, তা সবসময় মনে থাকবে। তাছাড়া এরই মধ্যে আপনি কী কী অর্জন করেছেন সেটাও চোখের সামনে থাকবে।
যখনই অনুপ্রেরণার অভাব বোধ করবেন, এই স্টেটমেন্টhashtagক্যারিয়া hashtagসাফল্য hashtagটিপসরটি আরেকবার পড়ে নেবেন।
